হেমন্ত বিশ্বাস:
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগ ও প্রমোশন আপগ্রেডেশনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। এসব নিয়োগ ও প্রমোশন আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে মানা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিধি এবং শর্ত। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে শর্ত – এমন অভিযোগও রয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থ বছরের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত খন্দকার নাসির উদ্দিনের মেয়াদকালে এসব নিয়ম ভঙ্গের রেকর্ড ভঙ্গ করা হয়। ২০১১ সালের ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের প্রথম সভার ২১ নং সিদ্ধান্তনুযায়ি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আনার্স ও মাস্টার ডিগ্রীধারী হতে হবে।ওই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময় র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদের ছোট ভাই ডিগ্রী পাশ তসলিম আহমেদকে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক প্রভাবশালী সদস্য শাহনেওয়াজ আলীর ছেলে রুবাইয়াৎ সাবি¦রকে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটলিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় সকল নিয়ম ভেঙ্গে। রুবাইয়াৎ সাব্বির অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগে ৩.৪২ জিপিএ প্রাপ্ত হয়ে অনার্স এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেভলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট এন্ড প্রাকটিস বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। নিয়োগপ্রাপ্ত বিভাগের সাথে তার অধ্যয়নকৃত বিষয়ের কোন সামঞ্জস্যতা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য খন্দকার নাসির উদ্দিনের আপন ভাতিজা খন্দকার মাহমুদ পারভেজকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্বেয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই অডিট রিপোর্টের অনুচ্ছেদ ৪০ পরিশিষ্ট ৪০.১ তালিকায় অপ্রয়োজনীয় শিক্ষকের বিবরণ প্রদত্ত হয় যেখানে ইনস্টিটিউট অফ লিবারেশন ওয়ার এন্ড বাংলাদেশ স্টাডিজে (বিলওয়াবস) নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হলেন, নুসরাত জাহান, সানিয়া আক্তার, মো. আবু সালেহ, সোহনা সুলতানা, ড. হাসিবুর রহমান ও আনিকা ই ইন্তিসার। কিন্তু তাদের কারোরই নিয়োগপ্রাপ্ত বিভাগের সাথে অধ্যায়নকৃত বিষয় সঙ্গতিপূর্ণ নয়।এছাড়া, সিএসই বিভাগের আক্কাস আলীর স্নাতোত্তর ডিগ্রী ছিল না। অধ্যায়নকৃত বিষয়ের সাথে সঙ্গতি না থাকার পরও নাবিদ আজিজকে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, কয়েকজন শিক্ষকের আপগ্রেডেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি মোতাবেক হয়নি বলেও অভিযোগে করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষকরা। বিধি বহির্ভূতভাবে ব্যবস্থাপনা বিভাগের ড. বশির উদ্দিনকে প্রভাষক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে, এসিসিই বিভাগের ড. মো. কামরুজ্জামানকে শর্ত পূরণ না করে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের ড. হাসিবুর রহমানকে পদের যোগ্যতা পূরণ না হওয়া সত্ত্বেয় সহযোগী অধ্যাপক পদে ও অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মাহফুজা খানম সহকারী অধ্যাপক পদের যোগ্যাতা পূরণ না হওয়ার পরও আপগ্রেডেশন দেওয়া প্রাপ্ত হয়েছে। আইন বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদানের দুই মাস পরেই ড. রাজিউর রহমান আপগ্রেডেশন পেয়েছেন। ওই বিভাগের মানসুরা খানম প্রভাষক পদে যোগদানের তিন মাস পরে সহকারী অধ্যাপক এবং সিএসই বিভাগের মনোয়ার হোসোনকে স্নাতোত্তর ডিগ্রী না থাকার পরও নিয়োগের শর্ত লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশিকুজ্জামান ভূ’ইয়াকে নীতিমালা শিথিল করে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে আপগ্রেডেশন দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তী ও নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ও সুনামগঞ্জ -৫ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান মানিকের (বোমা মানিক) ভাতিজা আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল আহমেদকে অবৈধভাবে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।২০২৫ সালের ১২-১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বাজেট অ্যাসেসমেন্ট টীম এডহক ভিত্তিতে এ নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি তেলে। এছাড়া ওই নিয়োগের বিরোধীতা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো তখন বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোরাদ হোসেনের সাথে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ এবং আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সুপারিশ ও অডিট রিপোর্টে যেসব পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ইতিমধ্যে সেসবের জবাব দেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply